
ছবি: সংগৃহীত
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, তিনি দেশটির অধিকাংশ আমদানি পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করবেন। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন একটি বাণিজ্য যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বিশেষত, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলো, যারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার, তারা এই নতুন শুল্কের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণার পর, চীনের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক এবং কিছুদিন আগে আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্কসহ মোট ৫৪ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং অন্যান্য অনেক দেশকেও ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক বাধা তৈরি হবে, যার ফলে মুদ্রার মান কমবে, পণ্যের দাম বাড়বে এবং জিডিপি হ্রাস পেতে পারে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উদারীকরণের বিপরীত এবং বেশ কিছু দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন নেতারা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা বলেছেন, এই শুল্ক নির্ধারণ একটি ভুল সিদ্ধান্ত, যা তাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে। চীনের সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ আত্মপরাজয়মূলক এবং একতরফাভাবে বাণিজ্য নীতি চাপানোর ফলস্বরূপ সবার ক্ষতি হবে।
বিশ্বের শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর মার্কিন, চীনা, দক্ষিণ কোরীয় এবং অস্ট্রেলিয়ার শেয়ার বাজারে ব্যাপক ধস নেমেছে। প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারমূল্য লক্ষণীয়ভাবে কমেছে, বিশেষত অ্যাপল, যার অধিকাংশ পণ্য চীন থেকে আমদানি হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় একটি ধাক্কা হতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় রপ্তানি ক্ষেত্র, এটি অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বাংলাদেশি পোশাকের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা মার্কিন ক্রেতাদের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অধিকাংশ রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৪০ কোটি ডলারের পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে। নতুন শুল্ক আরোপের ফলে, যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে, যা মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাক কম জনপ্রিয় করতে পারে। এই শুল্কের প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে, কারণ আমেরিকান ক্রেতারা বিকল্প দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারে, যেমন কেনিয়া বা মিসর, যেখানে শুল্ক কম।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ এতে মার্কিন ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এছাড়া, শুল্ক বাড়ানোর ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও বাণিজ্যিক অস্থিরতা সৃষ্টি হবে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ সরকারের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হচ্ছে—স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। স্বল্পমেয়াদে, সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদীভাবে, অন্য দেশে বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ