
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা: দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে আধা কিলোমিটারের দূরত্ব। দুর্নীতির সকল তথ্য প্রমাণ এবং কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে দুর্নীতির আখড়া থাকলেও নিশ্চুপ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এমনকি গত ৩ বছর ধরে চলা অনুসন্ধানে একটি বারও দুদক থেকে দুর্নীতির অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের নোটিশ বা তলব করা হয়নি। এমনকি কমিশন তাদের বক্তব্য শোনার প্রয়োজনও মনে করেনি। যে চিত্র অতীতে কখনো দেখা যায়নি দুর্নীতি দমন কমিশনে।
বলছি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঢাকা কাস্টম বন্ড কমিশনারেটের একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কথা। (বর্তমানে যা ভেঙ্গে উত্তর এবং দক্ষিণ করা হয়েছে)। এই বন্ড কমিশনারেটের দুর্নীতি নিয়ে ২০২২ সালে একটি অভিযোগ জমা পড়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে। দুদকের যাচাই বাছাই কমিটি বিষয়টি তখন আমলে নিয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তও নেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ৩টি বছর অতিবাহিত হলেও এখনো অনুসন্ধান কর্মকর্তারা কমিশনে দাখিল করেননি অনুসন্ধানি প্রতিবেদন। এমনকি দুর্নীতির তথ্য বা কিভাবে দুর্নীতি হয়েছে তার কোনকিছুর তথ্য জানতে চাওয়া হয়নি এনবিআর কর্মকর্তাদের কাছে। বরং জনশ্রুতি রয়েছে, আর্থিক লেনদেন এবং ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে এই অভিযোগ নিষ্পত্তির। এতে জড়িত রয়েছে কাস্টমস এবং দুদকের অনেক কর্মকর্তা। যারা এতো বড় দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। অপরদিকে দুদক কর্মকর্তাদের নিশ্চুপ এবং অনুসন্ধান রিপোর্ট কমিশনে না দিয়ে সময়ক্ষেপন করাকেও কেউ কেউ বলছেন দেনদরবারে ম্যানেজ হওয়ার কথা। যা এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সবার মুখে মুখে চলমান প্রথা।
অথচ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাকটিস বা যেকোন দুর্নীতির তথ্য পাওয়ার পর অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেই অভিযুক্তদের বক্তব্য শুনতে তলব করা হয়।কিংবা কমিশন থেকে নোটিশ পাঠানো হয় অভিযুক্তদের। তবে এবার ঘটেছে সম্পর্ণ তার বিপরীত চিত্র। বরং কমিশনে এক প্রকার চলছে অনুসন্ধান অনসন্ধান খেলা।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক মহাপরিচালক লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন মো.মঈদুল ইসলাম বাংলাবার্তাকে বলেন, দুদকের প্রাকটিস অভিযাগ পেলে শুরুতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নোটিশ এবং তলব করা হয়।এরপর নির্দিষ্ট তারিখে তাদের বক্তব্য শোনা হয়ে থাকে। এরপর অনুসন্ধান কমিটি বা অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহনের পাশাপাশি কমিশনে রিপোর্ট দাখিল করেন। তবে এক্ষেত্রে যদি এটা না হয় তাহলে এটা দুঃখজনক। একটি অভিযোগ এসেছে। যারা অভিযুক্ত তাদের বক্তব্য শোনা উচিত এবং তলব করা উচিত। বর্তমান কমিশনের উচিত বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া এবং কি হচ্ছে সেটা দেখভাল করা।
এদিকে অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ বছরে দুদক থেকে কোন ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়া এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও নিশ্চুপ থাকার কারণে বরং আরোও বীরদর্পে দুর্নীতি করে যাচ্ছে এসব কর্মকর্তারা। এমনকি একাধিক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিও হয়েছে ইতোমধ্যে। যার কারণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্নীতির স্পষ্ট চিত্র থাকার পরও যখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না ফলে তারা আঙ্গুল ফুলে হচ্ছে কলাগাছ। আর এভাবেই দুর্নীতিগ্রস্থ এনবিআরের কর্মকর্তারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর এই বিষয়ে দুদকের ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তলছেন কেউ কেউ।
দুদকে দায়ের হওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তখনকার ঢাকা কাস্টম বন্ড কমিশনারেট নিয়ে বলা হয় সিপাহী থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যন্ত ঘুষের হাট বসিয়েছেন। এখানে প্রতিদিন ঘুষের হাটে চলে লাখ লাখ টাকার লেনদেন। টাকা না দিলে চলে হয়রানি। নতুন লাইসেন্স ইস্যু,বার্ষিক নিরীক্ষা, প্রাপ্যতা, এইচএসকোড ইস্যু, ইউপি ইস্যু,কাটিং তদারকি থেকে শুরু করে সব কাজে দিতে হয় ঘুষ। আর ঘুষের হাটের দোকনদারি বসায় সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তারা। প্রতিদিন অভিনব সব কৌশল তৈরি করে নেওয়া হয় ঘুষ। ঢাকা কাস্টম বন্ড কমশিনারেট ভেঙে উত্তর এবং দক্ষিণ হয়েছে। তবে অনুসন্ধান বলছে, বর্তমানেও আগের মতো চলমান রয়েছে ঘুষের হাটবাজার।
লাইসেন্স ইস্যুতে নেওয়া হয় প্যাকেজ ঘুষ
নতুন লাইসেন্স ইস্যুতে ব্যবসায়ীরা সব কাগজপত্র জমা দেয়। এরপর লাইসেন্স শাখার উপ-কমিশনার (ডিসি) স্নিগ্ধা বিশ্বাসের নেতৃত্ব ফ্যাক্টরি পরিদর্শন করা হয়। তখন সদস্য কাস্টম নীতি মাসুদ সাদিকের প্রশ্রয়ে ডিসি স্নিগ্ধা যোগদানের পর থেকেই ঘুষ নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। প্যাকেজ ঘুষে রাজি না হলে নানা কারণ দেখিয়ে লাইসেন্স দেওয়া হয় না। লাইসেন্স দিতে ঘুষের প্যাকেজ ঠিক করে লাইসেন্স শাখার সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা মহসিন হোসেন, গোলাম সারোয়ার এবং রাজস্ব কর্মকর্তা মো আব্দুল হালিম। এরা সবাইকে জিম্মি করেই টাকা নেয়। লাইসেন্স নবায়নে ঘুষের শুরু করে ৫ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা। যেখানে কমিশনার পান ৫ লাখ, ডিসি পান ৬-৭ লাখ,আরও ২-৪ লাখ, এআরও ১০-১৫ লাখ,সিপাহী ও শাখা সহকারি ২০-৫০ হাজার।
বার্ষিক নিরীক্ষার নামে চলে প্যাকেজ ঘুষ
বন্ডের হয়রানি আর ঘুষের আরেক স্বর্গরাজ্য হলো বার্ষিক নিরীক্ষা শাখা। বন্ড প্রতিষ্ঠানের আমদানি রফতানি নিয়ে প্রতি বছর বার্ষিক নিরীক্ষা করার বিধান রয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে সমস্যা না থাকলেও দিতে হয় ঘুষ। যেসকল প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেনি তাদেরও বার্ষিক নিরীক্ষা করতে দিতে হয় ৫-৭ লাখ টাকা ঘুষ। আর যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম থাকে তাদের দিতে হয় ৫০ লাখ টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত। সমস্যার ধরণ অনুযায়ী নিরীক্ষা শাখার এআরও ঘুষের দরদাম ঠিক করে দেন। ঘুষের টাকায় জেসি দেন লাইসেন্স প্রতি ৪-৫ লাখ, রাজস্ব কর্মকর্তা সুভাস চন্দ্র বোস ২ লাখ, সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা শামসুননাহার ৫ লাখ, শাখা ৫০ হাজার, সিপাহী ও ফালতু নেন ১০ হাজার।
ইউপিতে ঘুষ নেওয়া হয় ডিপিএস পদ্ধতিতে
ডিপিএস পদ্ধিতে ঘুষ ভাবতে পারেন। কিন্তু ভাবনার জায়গা থেকে বেরিয়ে এবার একটু জেনে আসুন ঢাকা কাস্টম বন্ড কমশিনারেটে কিভাবে ডিপিএস পদ্ধিতিতে কে কে ঘুষ নিয়ে থাকেন। এখানে ঘুষ নিয়ে থাকেন জেসি আকতার হোসেন, ডিসি সাদিয়া আফরোজ, কালিদ হোসেন খন্দকার,আরও সুভাস চন্দ্র বোস, শিবানী রায়,মো শফিকুল ইসলাম। প্রতিটি ফাইল স্বাক্ষর করার পর অটো টাকা চলে যায় একাউন্ড নাম্বারে। সমস্যা না থাকলে ১০ হাজার আর সমস্যা থাকলে ১০৫ লাখ পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়।
এইচএসকোড অনুমোদনে দোকান বসিয়ে ঘুষ
একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠান। এইচএসকোড অনুমোদনে শাখায় ঘুষ দিতে হলো ১০ হাজার টাকা। ডিসি থেকে কমিশনার পর্যন্ত ফাইল অনুমোদনে ঘুষ গেল ২ লাখ টাকা। আরও ফাইলে নোট দিতে নেন ২-১০ লাখ টাকা। আর প্যাকেজের ঘুষ পান আরও, ডিসি ও জেসি। অনেক সময় এডিসি ও কমিশনারও পান।
প্রিভেনটিভের নামে চলে ঘুষ বাণিজ্য
বন্ড সুবিধার কাঁচামাল যেন খোলা বাজারে বিক্রি না হয় সেজন্য প্রিভেনটিভ টিম কাজ করেন। রাতে বিভিন্ন সড়কে, মহাসড়কে, বিভিন্ন কারখানায় অভিযান চালানোর কথা এই টিমের। পুরান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে রয়েছে বিশাল একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সাথে রয়েছে প্রিভেনটিভের বিশাল এক যোগসূত্র। এমন কি এই পণ্য কোথায় যাবে সেখানে পাহারা পর্যন্ত দিয়ে থাকে প্রিভেনটিভ টিম। যার বিনিময়ে নেন লাখ লাখ টাকা ঘুষ। অপরদিকে ডিপ্লোম্যাটিক বন্ড সুবিধায় আমদানি করা বেশিরভাগ মদ চলে যায় খোলাবাজারে। যেখানে সরাসরি জড়িত কমিশনার পর্যন্ত।
বন্ড খেকো জেসি আখতার ও আরও সুভাস
বন্ডে আতঙ্কের নাম জেসি আখতার হোসেন। বন্ডে ডিসি থেকে পদোন্নতি পেয়ে জেসি হয়েছেন। বন্ডদের কাছে তিনি আযান দিয়ে ঘুষ নেন। জেসি আখতারের ঘুষ নেওয়ার ভিডিও এনবিআরে গেলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নিকর্তৃপক্ষ। আখতারের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বন্ডে পদায়নের অভিযোগ রয়েছে। যে কমিশনার আসুক আখতার তার ইচ্ছামত পদায়ন নেন। ঘুষ না দিলে চরম হয়রানি করে আখতার। জেসি হিসেবে পদোন্নতিতে কোটি টাকা খরচ করেছেন। এনবিআরের একজন সদস্য ও প্রথম সচিবকে কোটি টাকার দিয়ে পদোন্নতি নিয়েছেন। পদোন্নতি পাওয়ার পর জেসি হিসেবে বন্ডে থাকার জন্য প্রথম সচিবকে ১ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন।
এছাড়া আরও সুভাস বন্ডে ইউডি ছিলেন। পরে সহকারি কমিশনার হিসেবে পদোন্নতি পেলে তখনকার কমিশনার তাকে বন্ডে রেখে দেন। এরপর থেকে সুভাস বন্ডে অঘোষিত দাদা হিসেবে পরিচিত। তিনি ৩ বার এআরও হিসেবে বন্ডে পোস্টিং নিয়েছেন। এই পোস্টিং এর জন্য সুভাস কোটি টাকা খরচ করেছেন। এমনিক এনবিআর চাইলেও সুভাসকে বদলি করতে পারে না।
বন্ড কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনার শামীমার ঘুষের ফিরিস্তি
৩জন সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তার মাধ্যমে ঘুষ নিতেন কমিশনার। আর এই কর্মকর্তারা বাসায় গিয়ে কমিশনারের টাকা পৌঁছে দিয়ে আসেন। এছাড়া অতিরিক্ত কমিশনার শামীমা আক্তারের ঘুষ নেওয়ার পদ্ধতি আরও অভিনব। তিনি জিম্মি করে ঘুষ নেন না। রাজস্ব কর্মকর্তা,সহকারি রাজস্ব কর্মকর্তা ও সিপাহীদের মাধ্যমে ঘুষ নেন শামীমা। এরাই শামীমার টাকা বাসায় ও নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়।
অপরদিকে ডিসি সাদিয়া আফরোজ ও প্রিয়াংকা দাস শিপুও একইভাবে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ঘুষ নিয়ে থাকে।
এ বিষয়ে জানতে দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বাংলাবার্তার কাছে কোন কথা বলতে রাজি হননি।
তবে এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ও দুদক সংষ্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান বাংলাবার্তাকে বলেন, এমন ঘটনা ঘটে থাকলে দুদকের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। আমি বিষয়টি নিয়ে কমিশনের সঙ্গে কথা বলবো। যারা অনুসন্ধান কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের গাফিলতি রয়েছে কিনা কিংবা অনুসন্ধান কমিশনার বিষয়টি জানেন কিনা আমি কথা বলবো। এভাবে বছরের পর বছর অনুসন্ধান চলতে পারে না। নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করার সুপারিশ আমাদের রয়েছে। দুদকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় আশা করি এমনটা তারা করবেন না।